শোক সংবাদ

 

অত্যন্ত  ভারাক্রান্ত হৃদেয় আপনাদের সকলকে জানাতে চাই যে, বাংলাদশ ওয়াইএমসিএ জাতীয় পরিষদের প্রাক্তন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক, মি: ম্যাথিউ মালাকার, বিগত ৬ ফ্রেব্রুয়ারী ২০১১ তারিখে ঢাকার এক স্থানীয় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর। তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগে ভুগছিলেন। আমরা তার আত্মার চির শান্তি কামনা করি। 

প্রায়ত ম্যাথিউ মালাকার ছিলেন বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ জাতীয় পরিষদের প্রথম পূর্ণকালীন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক। ১৯৭ সালে তিনি জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন এবং ১৯৮৮ সালে তিনি জাতীয় পরিষদ হতে অবসর নেন। এর পর তিনি বিশ্ব ওয়াইএমসিএ'র একজন সম্পাদক হিসাবে বছর দু'য়েক সুদানের রাজধানী খার্তুমে কর্মরত ছিলেন  সুদান হতে ফিরে তিনি পুনরায় বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ জাতীয় পরিষদে ভারপ্রাপ্ত জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পালন করেন ১৯৯২ হতে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত।

তিনি ১৯৩৩ সালে ১০ অক্টোবর বরিশাল জেলার, গৌরনদী থানার অন্তর্গত জোবার পাড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশবে তিনি নিজ গ্রামে অতিবাহিত করেন এবং বিদ্যালয়ের অধ্যয়ন শেষ করে,  বরিশাল শহরে তার কলেজ জীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে তিনি পঞ্চাশ দশকের শেষার্ধে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে স্নাতক ডিগ্রী লাগ করেন।

তার কর্মজীবন শুরু হয় সেপ্টেম্বর ১৯৫৭ সালে। এই সময় তিনি জাতীয় চার্চ পরিষদের,  অর্থনৈতিক ও সমাজ কল্যাণ বিভাগের একজন সমবায় কর্মকর্তা হিসাবে চাকুরীতে যোগদান করেন। ১৯৭০ সালে ঐ বিভাগের পরিচালক পদে তিনি পদোন্নতি লাভ করেন । ১৯৭৩ সালে তিনি ইন্টারন্যাশনাল ভোলান্টারী সার্ভিসেসে সহযোগী পরিচালক পদে যোগদান করেন। ঐ সময় তিনি বাংলাদেশ ফ্যামিলি প্ল্যানিং কোঅর্ডিনেটিং কাউন্সিল গঠন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভাবে যুক্ত ছিলেন।

জাতীয় চার্চ পরিষদে চাকুরী কালীন সময়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউওয়ার্কে তিনি কোন এক প্রশিক্ষণে থাকাকালীন সময় ১৯৬১-১৯৬২ সালের দিকে তিনি ওয়াইএমসিএ'র সংস্পর্শে আসেন। নিউওয়ার্ক ওয়াইএমসিএ'র বিখ্যাত স্লোনস্ হাউসে তিনি কয়েক দিন ছিলেন। সেই থেকে তিনি এ দেশে ওয়াইএমসিএ প্রতিষ্ঠা করার কথা চিন্তা করেন।   দেশে ফিরে তিনি, সমমনা কয়েকজন বন্ধুদের নিয়ে ১৯৬৫ সালে প্রথম ঢাকায় ওয়াইএমসিএ গঠন করেন। ঢাকা ওয়াইএমসিএ 'র এডহক কমিটির তিনিই প্রথম আহ্বায়ক নিযুক্ত হন। পরবর্তী কয়েক বছর তিনি প্রায়ত সুশান্ত অধিকারীর সাথে একত্রে ওয়াইএমসিএ'র সেবায় মনোযোগী হন।

দেশ স্বাধীনের পর, কয়েকটি স্থানীয় ওয়াইএমসিএ গঠিত হয় এবং পরবতীর্তে বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ জাতীয় পরিষদ গঠিত হয়। জাতীয় পরিষদ গঠনে তিনি বিশেষ ভুমিকা রাখেন এবং ১৯৭৫ সালে তিনি অবৈতনিক জাতীয় সাধারণ সম্পাদকের দ্বায়িত্ব পান এবং এর পর তিনি ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাস হতে পূর্ণকালীন জাতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। 

তাঁরই ঐকান্তিক কর্মপ্রচেষ্টার ফলে ১৯৭৬ সালে জাতীয় পরিষদ, বিশ্ব ওয়াইএমসিএ'র সদস্যপদ লাভ করে। ঐ বছর আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত বিশ্ব ওয়াইএমসিএ' এর ৮ম ওয়ার্ল্ড কাউন্সিলের সভায় এই সদস্যপদ প্রদান করা হয়। বলা বাহুল্য যে,  প্রয়াত ম্যাথিউ মালাকার ঐ সভায় বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।

ম্যাথিউ মালাকার বাংলাদেশের স্থানীয় ওয়াইএমসিএ সমূহ গঠনে বিশেষ ভুমিকা রাখেন এবং তার আমলেই বাংলাদেশে ৮টি স্থানীয় ওয়াইএমসিএ গঠিত হয়। স্থানীয় ওয়াইএমসিএ সমূহের ক্ষমতায়নে তিনি নিরলস কাজ করে গেছেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রায় প্রতিটি ওয়াইএমসিএ  নিজস্ব জমি ও ভবন নির্মাণে সমর্থ হয়। তাঁর স্বপ্ন ছিল যে, সকল স্থানীয় ওয়াইএমসিএ যেন নিজ পায়ে দাঁড়াতে পারে, আর এই লক্ষ্যে তিনি কাজ করে গেছেন। বলতে দ্বিধা নেই যে,  অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাঁর এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে। তিনি সবর্দা ওয়াইএমসিএ'র  সদস্যদের ও কর্মীদের প্রশিক্ষণের উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করতেন। এর জন্য তিনি ১৯৮৫ সালে সাভারে প্রায় দু'একর জমির উপর ওয়াইএমসিএ জাতীয় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করেন।

জাতীয় সাধারন সম্পাদক থাকাকালীন সময় তিনি, অনেক দেশ ভ্রমণ করেন। সেই সাথে বৈদেশিক অনেক ওয়াইএমসিএ'র সাথে ভাতৃপ্রতীম সম্পর্ক গড়ে তুলেন। যার ফলশ্রুতিতে বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ'র আজ অনেক ভাতৃপ্রতীম বৈদেশিক ওয়াইএমসিএ রয়েছে,  বিগত সময়ে তাদের সাহায্য সহযোগীতার কারণেই আজকে বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ এতদূর এগুতে পেরেছে। 

অবসর গ্রহণের পর ম্যাথিউ মালাকার, তাঁর নিজ গ্রাম, বরিশাল জেলার অন্তর্গত গৌরনদীর কাছে অবস্থিত জোবার পাড় গ্রামে ফিরে যান। সেখানে তিনি জীবনের বাকী দিনগুলোতে,  স্থানীয় মন্ডলীর উন্নয়ন কর্মকান্ডে নিজেকে জড়িত রাখেন।

স্বপ্নদ্রষ্টা এই মহিয়ান পুরুষ, আন্তঃমান্ডলিক সম্পর্ক উন্নয়নে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। এর জন্য বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএর  প্রকাশ ঘটে একটি আন্তঃমান্ডলিক সংস্থা হিসাবে। তাঁর প্রচেষ্টায়, ওয়াইএমসিএ'তে শুধু মাত্র সকল মন্ডলীর মিলন ক্ষেত্রে পরিণত হয় নাই,  বরং এমন একটি সম্মিলনীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে সকল মন্ডলীর সদস্যরা একত্রে বসে একই পিতা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতে পারে। এই ভাবে আজ ওয়াইএমসিএ সর্বমন্ডলীর মিলন সেতু হিসাবে কাজ করছে।

ম্যাথিউ মালাকার দেশে বিদেশে অনেক গুনগ্রাহী রেখে গেছেন। ওয়াইএমসিএ'তে সম্পৃক্ত অনেকে তাঁর আদর্শে  অনুপ্রাণিত হয়ে আজও ওয়াইএমসিএ'র সেবায় নিজেদেরে ব্যপৃত রেখেছে । অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ম্যাথিউ মালাকারের নিরহংকার জীবনে ধৈর্য্য, সহিষ্ণুতা, সততা, আন্তরিকতা ছিল তাঁর অলংকার। তাঁর কর্মনিষ্ঠার ফল হচ্ছে আজকের বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ। বোধ করি,  ওয়াইএমসিএ'র জন্য তিনি এ জগতে প্রেরিত হয়েছিলেন তাই ওয়াইএমসিএ'র জন্যই তিনি তার জীবন উৎসর্গ করে ছিলেন।

বাংলাদেশ ওয়াইএমসিএ প্রতিটি সদস্য, প্রতিটি কর্মী,  তাঁর অবদানের জন্য আজ তাঁকে কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছে। 

প্রয়াত ম্যাথিউ মালাকারের নশ্বর দেহ বিগত ৭ ফেব্রুয়ারী ২০১১ তারিখে, তাঁর নিজ গ্রাম জোবারপাড় করবস্থানে সমাহিত করা হয়।

তাঁর মৃত্যুতে যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে, তার পূরণ করার মত নয়। তাঁর শোক সন্তপ্ত পরিবারের সকলকে আমরা গভীর সমবেদনা জানাই।